দিকভ্রান্ত অর্থনীতি

করোনার এই ক্রান্তিকালে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটা বিষয়ে সুস্পষ্ট দ্বিমত লক্ষ্য করা যায়। যেহেতু করোনার কারণে লোকজনের চাকুরী নেই, তাই তাই আয়ও নেই। নেই চাহিদা কিংবা উৎপাদন। এমন অবস্থায় একদল অর্থনীতিবিদ বলছেন সাতপাঁচ না ভেবে সবার হাতে টাকা তুলে দেয়া হোক। যেটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে হেলিকপ্টার মানি। মানুষের হাতে টাকা গেলে চাহিদা বাড়বে। ফলশ্রুতিতে বাড়বে উৎপাদনও। তাদের প্রশ্ন হলো, লোকজন বেঁচে না থাকলে অর্থনীতি দিয়ে হবে কি? এ কথা ফেলে দেয়ার মতো না মোটেও। এইদলে আছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বন্ধোপাধ্যায় বা আহমেদ মুশফিক মোবারক এর মতো লোকজন। 

অন্যদিকে আরেকদল অর্থনীতিবিদ বলছেন সরাসরি টাকা পৌঁছে দেয়া কোন সমাধান হতে পারেনা। উল্টো অনেক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি তার একটা কারন। আরও বেশকিছু কারন রয়েছে যেগুলোর বিবেচনায় অন্তত আমাদের দেশে এই হেলিকপ্টার মানি কার্যকরী নয়। আমাদের মতো দেশের দুর্বলতাগুলো হলো, খুব অল্প সংখ্যক মানুষ ট্যাক্স দেয়। আবার সরকারের রয়েছে অনেক ব্যাংক নির্ভরশীলতা। তাছাড়াও দেশের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থা ভঙ্গুর ও নাজুক। তার উপর দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার ৫.৬%। এমতবস্থায় অর্থনীতির চাকা ঘুরাতে অতিরিক্ত টাকা যোগ করা হলে সেটা আশানুরূপ চাহিদা তৈরিতে সমর্থ হবেনা। উল্টো স্ট্যাগফ্লেশন অবস্থা দেখা দিতে পারে। এই দলে আছে দেশীয় থিংক ট্যাংক সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠান।  

সংকট যখন উভয় দিকেই, তখন আগুনে ঘি ঢেলেছে বেশকিছু সংবাদপত্রের বিভ্রান্তিকর শিরোনাম। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭০,০০০ কোটি টাকার ফান্ড তৈরির সিদ্ধান্তের খবরে অনেকেই ধন্দে পড়েছেন। সাধারণ জনগণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা কোরা বাংলায় চেঁচামেচি করছেন এই ভেবে যে, দেশ বোধহয় জিম্বাবুয়ে হতে বেশী দূরে নেই। আসল ব্যাপার হলো, এখানে সরকার নতুন করে টাকা ছাপাতে যাচ্ছেনা। বরং Quantitative Easing (QE) এর মাধ্যমে এই ফান্ড তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নীচের চার্টের সাহায্য নিলে বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হবে।

https://qph.fs.quoracdn.net/main-qimg-d4b2bdc401cf5ce50895c917220e1af1

সহজ বাংলায় Quantitative Easing (QE) হলো – সম্পদ, বন্ড, আমানত ইত্যাদির বিনিময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের ঋণ দেয়ার সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে রেপোরেটও কমিয়ে দেয়া হয়। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংক খুব অল্প সুদে ঋণ ঘোষণা করতে পারে। তাই নাজুক পরিস্থিতিতেও লোকজন ঋণ নিতে উৎসাহিত হবে। তারা সে ঋণ উৎপাদনে খরচ করবে। হাতে টাকা আসলে চাহিদাও বাড়বে। ফলে অর্থনীতি নতুন করে জাগ্রত হবে।

https://qph.fs.quoracdn.net/main-qimg-a09e38b6c9364307a367c17a84b96fc4

এই ৭০ হাজার কোটি টাকার পুরোটাই দেয়া হবে ঋণ হিসেবে, ব্যাংকের মাধ্যমে। এমনিতেই সরাসরি হাতে হাতে টাকা দেয়া হলে বা আকাশ থেকে টাকা ছিটানো (হেলিকপ্টার মানি) তখন সেটা বিশাল ঝুঁকির কারন হতে পারতো। হয়তো বিশাল ইনফ্লেশন বা মুদ্রাস্ফীতির কারন হয়ে দাড়াতো। এখানে সেটা তো হবেই না, বরং এভাবে টাকাটা কতোটা মানুষের হাতে ছড়াবে সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে অর্থনীতিবিদদের। কারন ব্যাংক ব্যবস্থা এখনো সব মানুষের কাছে সহজ নয়।

এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ সার্বিক বিবেচনায় উপযুক্ত মনে হচ্ছে। হেলিকপ্টার মানিতে যাওয়ার আগে অনেক চেষ্টা এখনো করার বাকি। যেমন, খুব বেশী প্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদে বাকিগুলোর বরাদ্ধ আপাতত স্থগিত করা যেতে পারে। পাশের ভারতের মতো ছাটাই করা যেতে পারে আমাদের আমলাদের বেতনও। ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সি আর আর), রেপোরেট এসবেও এখনো কিছুটা কমানোর সুযোগ আছে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় সেখানে খরচ পূর্বের তুলনায় কমে যাবে। তাছাড়া বৈদেশিক অনুদান তো আছেই। তাই দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে টাকা ইনজেক্ট না করে বরং সম্ভাব্য সব উপায়ে সিস্টেমকে এফিশিয়েন্ট করেই ফান্ড তৈরির প্রচেষ্টা থাকা উচিৎ। এতে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে।

— — — — —

Author can be reached at yusufmunna16@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *