জিপিএ ইনফ্লেশন, ইঁদুর দৌড় ও একটি প্রস্তাবনা

রিথিংকিং ইউনিভার্সিটি এডমিশন টেস্ট

Image result for ভর্তি পরীক্ষা
ছবি – ডেইলি বাংলাদেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য তার উচিৎ শিক্ষা বইতে লিখেছেন “সর্বোত্তম তোতাপাখি বাছাই করা নয়, প্রতিযোগিতামূলক পরিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তথ্যের যৌক্তিক বিশ্লেষণে সক্ষম শ্রেষ্ঠ চৌকশ শিক্ষার্থীটিকে খুঁজে বের করা। ভাবতে শেখেনি, শুধু মুখস্থ করে উগরে দিতে শিখেছে- চোখ কান বন্ধ করে এমন প্রার্থীদের নির্বাচন করা হলে শিক্ষা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও দেশ্রক্ষা – রাষ্ট্রের এই চতুরঙ্গের কোথাও গুণগত কোন পরিবর্তন আসবে না আরও বহু প্রজন্মে” 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই বলেন শুধু জিপিএ ফাইভ নয়, বরং তাদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহনেও উৎসাহিত করতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, প্রক্রিয়াটা এখন এমনভাবে সাজানো, সেখানে সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশনেয়াটা তো দূরে থাক, সামান্য দম ফেলারও ফুসরত নেই। সেই সকালে কোচিং দিয়ে শুরু, কোচিং থেকে স্কুল, স্কুল থেকে কোচিং, কোচিং থেকে বাসা, বাসায় এসে একটু বসতেই হোম টিউটর। সহশিক্ষা কার্যক্রমে যাওয়ার সময়টা কোথায় বলুন তো?  

স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়, মোদ্দা কথায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জিপিএকে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই খুব স্বাভাবিকভাবেই সংশ্লিষ্ট সবাই জিপিএ জিপিএ করছে। নাহলে বলুন তো কোন বাবামা চায় তাদের সন্তানদের সারাদিন গাধার মতো খাটাতে? বাবামাদের কি ইচ্ছে করেনা তাদের সন্তানদের খেলার মাঠে, পার্কে নিয়ে যেতে? ইচ্ছে করে না বসে গল্পগুজব করতে? ইচ্ছে করেনা কিছুদিন ছুটি নিয়ে পরিবারসহ কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসতে? বাবামাদের তাই দোষ দিয়ে লাভ নেই। তারা যে নিরূপায়।

আমরা এতোই বেশী পরীক্ষা আর জিপিএমুখী হয়েছি যে, শিক্ষার আসল যে উদ্দেশ্য সেটাই আমরা ভূলে বসেছি। শিক্ষার বিষয়ে কথা বলতে গেলে জাপান কিংবা ফিনল্যান্ডের উদাহরণ শুনেছি অগনিত। তারা জিপিএ’র চেয়ে মানুষ হওয়াটাকেই প্রাধান্য দেয় বলেই তাদের দেশগুলো এতোটা এগিয়ে। মানুষগুলো নিয়েই তো আমাদের দেশ। যেদেশের মানুষ ভালো না সে দেশটা এমনিতেই ভালো হবে না – এটাই স্বাভাবিক। যে দেশে জীবনের নিরাপত্তা নেই, যে দেশে শান্তি নেই, সে দেশে আপনি ৬-৭ শতাংশ জিডিপি, বড় বড় সেতু কিংবা স্যাটেলাইট দিয়ে কি করবেন?

এইসএসসি পাস করার পর একজন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যে প্রস্তুতি নিয়ে থাকে সেটাকে মোটামুটি বিসিএস এর প্রস্তুতি বলা যায়। বিসিএস এর যে লিখিত পরীক্ষা সেটা একজন সদ্য এইসএসসি পাস ছাত্রকে কিছুদিন সময় দিলে সেও আয়ত্বে আনতে পারবে। তাহলে প্রশ্ন হলো যে পরীক্ষা এইসএসসি পাসের পরই দেয়া সম্ভব সেটা খামোকা চার বছর পরে দিতে যাবো কেন? অবশ্যই প্রযুক্তি, ডাক্তারি কিংবা স্থাপত্য সহ কিছু বিষয় আছে যেগুলোতে শুধু স্নাতক কেন, আরও অসীম জ্ঞান দরকার। তবে অবশ্যই সব বিষয়ে নয়। কেন আমরা কি দেখিনা যে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে তাকে কাস্টমস অফিসে চাকরি করতে? দেখিনা এমবিএ করার পর গানের দল নিয়ে নেমে পড়তে? তাহলে তার স্নাতকের মূল্যটা কোথায়। এরকম অগনিত উদহারন দেয়া যায়। আমরা উচ্চশিক্ষাটাকে আবশ্যক বানিয়ে ফেলেছি। আসলে তো ব্যাপারটা তেমন নয়। আপনি বলতে পারেন, স্নাতক না করলে চাকরি পাবো কিভাবে? এজন্য সরকারকে যেমন শিক্ষার মাণ বাড়ানোয় মনোযোগ দিতে হবে, অন্যদিকে চাকরিদাতাদেরও বিষয়টা বুঝতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় যেকোন দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সেখানকার ছাত্র, শিক্ষক এবং তাদের উদ্ভাবন ও চিন্তা চেতনা একটি দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোকে সত্যিকার অর্থেই বিশ্ববিদ্যালয় বানানো গেলে সে দেশ এমনিতেই এগিয়ে যাবে। নাহলে দেখুন না বিশ্বের বড় বড় সব উদ্ভাবন কিংবা প্রতিষ্ঠানের দিকে, সবকিছুর মূলে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অথবা শিক্ষকগণ।

আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য দুটো জিনিস চায় – এসএসসি এবং এইসএসসি’র জিপিএ এবং একটা বহু নির্বাচনী পরীক্ষা। বিশ্বের শীর্ষ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর পড়তে গেলে এসএট বা জিআরই দিতে হয়। সেসব পরিক্ষায়ও প্রশ্ন হয় বহুনির্বাচনীতে। দুটোই বহুনির্বাচনী হলেও প্রশ্নের ধরনে আছে বিশাল তফাৎ। তারা যতোটা চিন্তাভাবনা করে প্রশ্নগুলো করেন, আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগন ততোটা সময় দেননা। তাই আপনি নির্দিষ্ট কিছু বইয়ের পুরোটুকু আয়ত্বে আনতে পারলেই কেল্লা ফতে। তাই এখানে একজন ছাত্রের স্মৃতি পরীক্ষা ছাড়া বিশ্লেষণী ক্ষমতা কিংবা চিন্তাশক্তিকে কোন গুরুত্বই দেয়া হয়না।

ওই যে বলছেন মানসিক বিকাশ, সেটার জন্য ছাত্রছাত্রীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে উৎসাহিত করতে হবে। কিন্তু সময় যে নাই? তাই ইঁদুর দৌড় থেকে মুক্তির সহজ সমাধান হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষায় জিপিএ’র পাশাপাশি তার হাইস্কুল এবং কলেজের সহশিক্ষা কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করা। বিশ্বের নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এটাই করা হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীর শুধু একাডেমিক নয় বরং দেখে সে কতো সময় স্বেচ্ছাসেবায় অংশ নিয়েছে। দেখে তার নেত্রিত্বের অভিজ্ঞতা আছে কিনা। দেখে সে কি ধরনের সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কাজের সাথে যুক্ত। এসব দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেয় ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রী মানুষ হিসেবে কেমন। আমরাও এটাতে নজর দিলে অনেকগুলো অসাধারণ ব্যাপার ঘটে যাবে। যেমন পড়াশুনায় একঘেয়েমি আসবেনা, তাদের সৃজনশীল সত্বার বিকাশ ঘটবে, তারা অবসরে সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকায় বখে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে, ছাত্রছাত্রীদের চিন্তাশক্তি প্রখর হবে, যোগাযোগ, দলগত কাজ, নেত্রিত্বের মতো গুণাবলী অর্জন করতে পারবে, মেধাবীরা সুযোগ পাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আরও সৃজনশীল হবে। সর্বোপরি বাবামা, ছাত্রছাত্রী কিংবা শিক্ষকগন – কেউই আর শুধু জিপিএ-জিপিএ করবেনা। আপনি বলতেই পারেন, সব ঠিক আছে, কিন্তু যে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে চায় তার আঁকার গুণ বিবেচনা করা কি যুক্তিযুক্ত? আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমাদের জামাল নজরুল ইসলাম অবসরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেন, আইনস্টাইন বেহালা বাজাতেন। এগুলোই ছিলো তাদের মনের খাদ্য, এগুলোই তাদের মাথা খুলে দিয়েছে।

অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্যে কথা দিয়েই শেষ করি – “সুদক্ষ, মননশীল, বৈষম্য, শ্রেনিবিদ্বেষ, সীমাহীন ও লজ্জাকর দুর্নীতি, অন্যপেশা বা অধস্তন্দের প্রতি উদ্ধত তাচ্ছিল্য এবং জবাবদিহির অভাবসহ আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের যাবতীয় দুরারোগ্য ব্যাধির মূলেও হয়তো আছে এই করুন তোতাকাহিনি।” তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষায় কেন সহশিক্ষা কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করা হবেনা?    

বুক রিভিউ | একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়

এক নাগাড়ে পড়ে শেষ করেছি এমন বই খুব কমই আছে আমার কাছে। একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায় সেরকম একটি বই। ড রউফুল আলমের বেশকিছু লেখা আমি প্রথম আলোয় পড়েছিলাম। মূলত সেগুলো ভালো লাগাতেই এই বই কিনতে আগ্রহী হই। নাম শুনে অনেকেরই ধারণা হতে পারে হয়তো রাজনীতি আর অর্থনীতির কাঠখোট্টা বিষয় দিয়ে সাজানো বইটি। আসলে তেমনটি নয় মোটেও। এটি পুরোদমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে লেখা একটি বই যেখানে দেশের অন্যান্য ইস্যুগুলোকেও শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অতিমাত্রায় বিসিএস প্রীতি, একর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাণ মাপা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডিটাকে গোটা দুনিয়া ভেবে বসে থাকার বিষয়গুলো যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি আলোচিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় কুম্ভিলতা, পদন্নোতির মতো বিষয়গুলো।

ছবিতে বই ও লেখক // ড রউফুল আলম

লেখক তার পড়াশুনা ও গবেষণার স্বার্থে ইউরোপ আর আমেরিকার নানান প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। মূলত তিনি তার অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন বিষয় ছোট ছোট আর্টিকেলে তুলে ধরেছেন। লেখক বইয়ে দেশের উন্নতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। এই বইয়ে তিনি কিছু বিষয় নিয়ে এসেছেন যা আপনাকে নতুন করে ভাবতে শেখাবে। বিদেশে থাকা দেশের মেধাবী গবেষকদের ফিরিয়ে এনে কিভাবে দেশ ও দশের স্বার্থে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে অনেকবার বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দেশের উদহারন দিয়ে দেখিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণার চাইতে রাজনীতিতে বেশী সময় দেয়ার সমালোচনা করেছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যায় কিন্তু গণিত অলিম্পিয়াড, জুনিয়র সায়েন্স অলিম্পিয়াডের মতো উদ্যোগগুলোকে ফান্ডিং করার জন্য রাষ্ট্রের টাকা থাকেনা এমন বিষয়গুলোকে টেনে এনেছেন। প্রশ্ন করেছেন, ক্রিকেট খেলোয়াড়দের যদি এতো এতো পুরস্কার দেয়া যায় তাহলে রাষ্ট্র কেন বিভিন্ন অলিম্পিয়াডের মেডালিস্টদের কিছু দিবেননা। তাছাড়াও আমাদের অভিভাবকদের নিয়েও বেশকিছু বিষয় আলোচিত হয়েছে এই বইয়ে। সবমিলিয়ে দেশের মেধাবীদের পরিচর্যা, মেধাবীদের মূল্যায়ন, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা, গবেষণায় মনোযোগ বাড়ানো নিয়ে প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা এই বইটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা একজন নাগরিক – সবার জন্যই একটি চোখ খুলে দেয়ার মতো ও সুখপাঠ্য।

প্রকাশ করেছে সমগ্র প্রকাশনী। বইয়ের গায়ের মূল্য ৩০০টাকা। তবে মেলা থেকে ২৫% ছাড়ে ও বিকাশে পেমেন্ট করা সাপেক্ষে অতিরিক্ত ১০% ছাড়ে বইটি কিনতে পাওয়া যাবে। তাছাড়া রকমারিতেও পাওয়া যাচ্ছে বইটি।