একা হাঁটুন, নিয়ম করে হাঁটুন

নতুন একটা অভ্যাস শুরু করেছি। হাটছি। নিয়ম করে, একা একা। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার সকালেবেলা টানা একঘন্টা হাটছি। আকাবাঁকা উঁচুনিচু সার্সন রোড, চট্টেশ্বরী বা জামালখান। আবার কোনোদিন হয়তো সম্পূর্ণ নতুন কোন গলি যেটা আগে কখনও মাড়াইনি। এই সাপ্তাহিক হাঁটাহাঁটির নিয়ম হলো – এক. সাথে কাউকে নেয়া যাবেনা। দুই. চলার সময় ফোন ব্যবহার করা যাবেনা। কল আসলেও ধরা যাবে না। নোটিফিকেশনও চেক করা যাবেনা।

আমরা সবাই ব্যস্ত। সারা সপ্তাহ মিটিং-মিছিল, ঝগড়াঝাঁটি, ঠেলাঠেলি নিয়ে চলে জীবন। এর সবই ক্যাওস। এতো ঝুট ঝামেলার মধ্যে জীবন কাটাতে কাটাতে বিতৃষ্ণা চলে আসে। প্রাত্যাহিক জীবনে আমাদের এতো এতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, দ্রুত বই সময় নিয়ে ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ খুব কম। আবার অনেক সময় দেখা যায়, কাজ-কাজ-কাজ করতে গিয়ে নিজেকে আমরা হারিয়ে ফেলি। আমি কে, কি চাই জীবনে – এসব নিয়ে ভাবাই হয়ে উঠেনা।

এতোসব ঝামেলার ভেতরে এই নিয়ম করে এক ঘণ্টা একা হাঁটা আপনার স্বস্তির কারন হতে পারে। নিজেকে খুজে পাওয়ার কারন হতে পারে। এই একাহাটা হয়ে উঠতে পারে মানসিক প্রশান্তির উৎস। সাথে একজন থাকলে বা নোটিফিকেশন, কল এসবকে সুযোগ দিলে, দেখবেন সেসবকে সন্তুষ্ট বা সার্ভ করতে গিয়ে অনেক বিষয় আপনি হারিয়ে ফেলছেন। ভুলে যাচ্ছেন। তাই এই কাজটা এইভাবে রিলিজিয়াসলি করতে হবে।

এই একা-হাটার সময়টাতে আপনি জীবন থেকে কি চান সেটা যেমন ভাবতে পারেন, আবার ভাবতে পারেন কিভাবে ব্যক্তিগত জীবনে ছোটো ছোটো সুখের উৎসগুলোকে গুরুত্ব দেয়া যায়। আপনি কাকে গুরুত্ব দিবেন আর কাকে দিবেন সেটাও ভাবতে পারেন। মোদ্দা কথা হলো, এই এক ঘন্টা শুধু আপনার। আপনিই সিদ্ধান্ত নিবেন আপনি কি ভাববেন। অথবা আদও ভাববেন কিনা। এই একা-হাঁটা আপনাকে জঞ্জালের দুনিয়া থেকে বের করে সম্পূর্ণ নিজের মতো কিছুক্ষণ সময় কাটাতে সাহায্য করবে। এভাবে নিয়ম করে একঘন্টা একা হাটলে দেখবেন এমন হাজারটা বিষয় আছে যেগুলো আপনি স্রোতের সাথে চলতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছিলেন। আমি নিজের ক্ষেত্রে অন্তত সেটা হতে দেখেছি।

তাই হাঁটুন। নিয়ম করে একা হাঁটুন। তবে সাবধান, ভাবতে ভাবতে যেনো কানা-গর্তে বা ম্যানহোলে পরে না যান। আপনার হাঁটা শুভ হোক।

 

প্রিয় অভিভাবক সমীপে…

এই লেখাটি যখন লেখার পরিকল্পনা করছি, এস এস সি, সুইসাইড – এই দুটি কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করে আমি অসংখ্য খবরের লিংক পেয়েছি। অতী পুরনো থেকে অতী সাম্প্রতিক খবরের ছড়াছড়ি এ নিয়ে। প্রতিবার একটা করে পাবলিক পরিক্ষার ফলাফল বের হয়। আর তার সাথে সাথে প্রকাশ হতে থাকে বাচ্চাদের আত্নহত্যার খবর।

সপ্রতি এস এস সি পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর পর একটা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাওর হয়ে উঠে। ভিডিওতে দেখা যায় কয়েকজন অভিভাবক নাচানাচি করছেন। একজন সাংবাদিক উনাদের কাছে যান এবং এই নাচানাচির কারন জানতে চান। উত্তরে তারা জানান তাদের মেয়েরা গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। তাই তাদের এই উদযাপন। সবাই মজা করে এই ভিডিও শেয়ার করছেন, আর হাসাহাসি করছেন। বাবামা’রা সন্তানের সাফল্যে আনন্দিত হতেই পারেন, স্বাভাবিক। কিন্তু আমি ভাবছি তার উল্টোটা। এতো এতো গোল্ডেন এ প্লাসের ভেতরে নেচে নেচে উদাযাপন করা অভিভাবকের কেউ একজনের সন্তানের ফলাফল এতোটুকু খারাপ হলে তার অবস্থা কি হতো ভাবুন তো? পুরো পজিটিভ এনার্জিটুকু একটা বাচ্চার উপর নেগেটিভ ফোর্স হিসেবে চাপতো! ভাবা যায়? তার মনে হবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অপরাধটা সে করে ফেলেছে। তাই গোটা দুনিয়া তার বিপরীতে। আর এই মুহূর্তে বাচ্চাটা যদি আবেগের বশীভূত হয়ে সুইসাইড করে ফেলে তাহলে কিন্তু বাবামা’রা ঠিকই বলবেন – কেনো এমন করলি আমার কলিজা? ফলাফল  খারাপ হয়েছে তো কি হয়েছে? কিন্তু বাস্তবতা হলো, ফলাফল  খারাপ করলে ঠিকই ওই ভয়ংকর খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হতো।

ছোট ছোট বাচ্চা, তাদের এমন আর কি কষ্ট যে নিজেকে একেবারে শেষ করে দিতে পারে? কিছুর কথা না ভেবেই এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো? আপনার মনে এমন হাজারো প্রশ্ন আসতেই পারে। আসলে আমরা সবাই এখন ভয়ংকর এক ইঁদুর দৌঁড় প্রতিযোগিতায় আছি। যে প্রতিযোগীতার কোনো শেষ নেই।  এই প্রতিযোগিতা আমাদের হতাশা ও বিষণ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। হতাশা মানুষের সৃজনশীলতা, বোধ ও বুদ্ধিমত্তা নষ্ট করে দিচ্ছে। পরিবারের চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মানুষকে আরও চাপের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। বাবামা’রা যুক্তি দেখাতে পারেন – কোনো বাবামা তো আর সন্তানের অমঙ্গল চায় না। চায় না সন্তানেরা খারাপ থাকুক, কষ্ট পাক। কিন্তু এতো পরিশ্রমের পরও যদি ভালো ফলাফল  না করে, সমাজে মুখ দেখাবো কি করে? তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, আপনারাই সমাজ বানিয়েছেন। একজন একজন করে গোটা সমাজকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন।

আপনার আচরন তারা দেখে শেখে। আপনাদের কাছ থেকেই তারা দেখে শিখে। আপনাকে দেখে তারা বুঝে এ প্লাস-ই সব। তারা দেখে এ প্লাস না পাওয়াদের কিভাবে দেখা হয়। বাচ্চাদের নিষ্পাপ মনটাকে অভিভাবকেরাই কালো করে তুলেন। তারা শিখিয়ে দেন পাশের জনকে নোট না দেয়ার কথা। তারাই বাচ্চাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেন যেকোনোভাবে এ প্লাসটা পেতে হবে। না হলে ষোলোআনাই বৃথা। আপনি যদি অভিভাবক হোন আপনাকে একটা প্রশ্ন করি। প্রশ্নটা থ্রি ইডীয়টস থেকে নেয়া। আপনি প্রতিদিন কোন টেস্টে কতো মার্কস পেয়েছ সেটা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু কখনোই কি জিজ্ঞেস করেছে সে তার বন্ধুকে সাহায্য করেছে কিনা? না, করেন নি। তাহলে তো সবকিছুর উর্ধে এ প্লাস-কে স্থান দেয়াটাই স্বাভাবিক।

স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম সেই ১৭ শতকে তার ‘আত্মহত্যা’ বিষয়ক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি কোনো মানুষ কখনোই তার জীবনকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সেই জীবনটা তার কাছে মূল্যবান থাকে।’ বিষণ্ণতা থেকে আবেগ তৈরি হয়, আশা চলে যায়, অন্য কোনো উপায় খুঁজে পায় না মানুষ, একমাত্র উপায় হয় তখন নিজের জীবন নিয়ে নেওয়া।

ও কখনো স্বার্থপরের মতো মরে যাওয়ার কথা ভাবেনি, ভেবেছে আমাদের মুক্তি দেওয়ার জন্য। আমরা ওকে বুঝাতে পারিনি যে তুমি একা নও। ফলাফল  যখন খারাপ হয়, তখন সে ভাবে তার আর কোনো উপায় নেই। কারন আপনি তার মাথায় ঢুকিয়েছেন যে, এ প্লাস সবকিছুর উর্ধে। এমনিতেই অপরিণত বয়স, তার উপর এতোকিছু তার মাথায় ধরে না। সে আসলে নিজে বাঁচার উপায় হিসেবেই মৃত্যুকে বেছে নেয়।

পড়ালেখা, ভালো ফলাফল অবশ্যই খুবই গুরুত্বপুর্ন। তবে এতোটা গুরুত্বপুর্ন নয় যতোটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবলে সে এর বিনিময়ে নিজের জীবনকে ছুড়ে ফেলার কথা ভাববে। ভাববে গোটা দুনিয়ার সবাই তার বিপরীতে। এ প্লাস কেন্দ্রিক এই দুনিয়ায় তার আর কোনো স্থান নেই। চলুন তাদের বুঝাই, এ প্লাস পাওয়া গুরুত্বপুর্ন, তবে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো কিংবা ভালো মানুষ হওয়া কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাবধান, খুব স্বার্থপর একটা প্রজন্ম গড়ে তুলছি আমরা। একজন অভিভাবক হিসেবে এর দায় আর ফলাফল কোনোটাই এড়াতে পারেন না আপনি।  

নানাবাড়ি, আমার হল (ডর্ম) জীবন আর আমি

অনেদিন লেখা হয় না। আজ শুক্রবার। ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হয়েছে। ঠিক দেরি হয়েছে বললে ভুল হবে। বরং বলি দেরি করেছি। কাল রাতে হঠাত কালবৈশাখী ঝড় হলো। এই এক ঝড়ে কতো কি হয়ে গেলো। অনেক অনেক দিন পর ভার্সিটির হলে বিদ্যুৎ চলে গেলো। পুরো হলের সব ছেলে পেলে তাই উদযাপন করতে রুম থেকে বেরিয়ে পড়ল। সবাই কমন করিডোরে এসে সজোরে চিল্লাতে লাগলো – শাহিইইইন… ধরে ফেল, ধরে ফেল। আধোঘুমে ছিলাম আমি। তাদের চিল্লাচিল্লিতে আমার ঘুম গেলো উবে। বুঝার চেষ্টা করলাম তারা কি চায়। বুঝতে পারিনি। পরে সকালে নাশতা খেতে যাওয়ার পথে এক বন্ধুর সাথে গল্প করছিলাম। সে জানালো এই ঘটনা নাকি নিয়মিত হয়। যখনই বিদ্যুৎ যায়, ছেলেপেলেরা কিছু একটা নিয়ে চিল্লাতে চিল্লাতে আকাশ আর ছাঁদ এক করে ফেলে। ওহ, বলা হয়নি, আমি হলে নতুন উঠেছি। তাই রীতিনীতি জানিনা ওতোটা। অনেকদিন হলরোডের একটা বাসায় থাকতাম একা। তাও থাকতাম জোর করে। একা থাকলে চিন্তা ভালো করা যায়। মনোযোগ দিয়ে কাজ করা যায়। কিন্তু শেষদিকে এসে মনে হলো, থাক, আর কয়দিনই বা আছি ভার্সিটিতে। যাই, একটু হলে থেকে আসি। ভিন্নকিছু উপভোগ করি। এভাবেই আমার হলে উঠা।

সকালে নাশতা যাওয়ার পথে নীচ তলায় এক বন্ধুর রুমে ঢু মারতে গেলাম। উদ্দেশ্য তাকে সাথে নিয়ে যাবো নাশতা করতে। তার রুমের পেছনের বারান্দায় গিয়ে দেখি এক পিচ্চি গাছ থেকে বরই পাড়ার চেষ্টা করছে। বেচারা নাগাল পাচ্ছে না। বারান্দাটা একটু উঁচু। আমি একটা ডাল টেনে তার হাতে ধরিয়ে দিতে যাবো, তখনই সে নিজেই আরেকটা ডাল ধরে দিলো টান। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি হাতে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করলাম। একটা কাঁটা ঢুকে গেছে হাতে। বেচারা ছোটো মানুষ বুঝতে পারেনি এমন হবে। আমি চলে এলাম।

হলের রাস্তাটার সামনে একটা আম গাছ আছে। বেশকিছুদিন ধরে নজর রাখছিলাম। প্রমান সাইজের হলেই হানা দিবো। এ জায়গায় একটা কথা বলে দিই – হলকে কেনো জানি আমার নানার বাড়ির মতোই মনে হয়। আম্মুর জন্ম একটা বাড়িতে ঠিক আছে, কিন্তু আশেপাশের সব বাড়িকেই আমরা নানাবাড়ি ধরে নিই। ধরে নেয়ার কারন প্রত্যেকের আতিথেয়তা। আমরা গেলে তারা এমন ভাবে করে, নিজের আপন নানাবাড়ি না ভেবে উপায় নেই। যাহোক, নানার বাড়ি গেলে দেখা যেতো চারদিকে অনেক গাছে। কোনো না কোনো গাছে কিছু না কিছু একটা ধরেছে। হয় নারকেল, নাহয় পেয়ারা, নাহয় বাতাবী লেবু আর নাহয় বরই। কাজিনরা দলেবলে যেতাম, দেখতাম, পছন্দ হলে খেয়ে ফেলতাম। কোথাও বলার মতো কেউ নেই। সবই আমাদের ইচ্ছা। হলের পরিবেশও একদম তাই। চারদিকে অনেক ফলমূলের গাছ। কোনো গাছে কাঠাল, কোনো গাছে পেয়ারা, কোনো গাছে গাব, ডাব, বা অন্যকিছু। যে যখন যেভাবে চায়, খেতে পারে। কেউ কিছু বলবে না।  

নাশতা করে ফেরার পথে আম গাছে চোখ পড়তেই দেখলাম আমটা প্রমান সাইজের হয়ে গেছে। অন্যকারো নজরে পড়ার আগেই পেড়ে নিয়ে উদরে চালান করে দেয়াটাকে যথার্থ মনে করলাম। যেই ভাবা সেই কাজ। রুমে এসে লবন দিয়ে আমটা খেতে খেতে ভাবছি, একটাই তো জীবন। টুপ করে কোনো একদিন মরে গেলেই তো সব শেষ। কি দরকার এতো চিন্তাভাবনার? কি দরকার এতো প্যাঁচাল করার? আহা, জীবনটা সুন্দর।        

আমাদের নাইন্টিনাইন ক্লাব

কতো ছোট্ট একটা জীবন। ছোট্ট এই জীবনে আমরা নানানভাবে ব্যস্ত হয়ে যাই। জড়িয়ে পড়ি মোহ-নানান মায়ায়। নানান বেড়া জালে। এই বেড়া জাল কাটিয়ে উঠতে গিয়ে আমাদের সম্মুখীন হতে হয় বিভিন্ন পরিস্থিতির। এসব পাড়ি দিতে দিতে নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলি। ফুড়ুত করে কোন সময় যে জীবনটা ফুরিয়ে যায় সেটা টেরই পাইনা। মৃত্যুর মতো সুনিশ্চিত বিষয়কে আমরা ভুলে যাই। এতো কিছু কেনো করি আমরা? কেনো জড়াই এতো মায়া? মোহে? কেনো এতো ধনসম্পদের পাহাড় গড়ি? জীবনটা একটু সাদামাটা হলেই বা সমস্যা কোথায়? অবশ্য, বোকার মতো আমরা দুনিয়ার এই ইঁদুর দৌড়ে এতোই মজে থাকি, এই প্রশ্ন মাথায় আসার সুযোগই হয়না।

অনেকদিনের ইচ্ছা একটা স্মার্টওয়াচ কিনবো। লেদারের একটা ব্যাগ নিবো। এক আউটলেটে সুন্দর ব্যাগ দেখেছি, ব্যাকপ্যাকটা চেইঞ্জ করবো। যতোবার টাকা হাতে পেয়েছি, এসবের কথায় মাথায় এসেছে। কিন্তু পরমুহুরতে ভেবেছি, না, থাক। টাকাটা বাঁচিয়ে রাখি। পরে বিপদে কাজে লাগবে। অথবা ভালো কোনো জায়গায় বিনিয়োগ করা যাবে। কিন্তু কই, অনেক টাকা এলো গেলো, বিনিয়োগ তো হলো না। না হলো বিন্যোগ, না পূরণ হল ছোট্ট ছোট্ট শখ, কি লাভ এতে? সত্যি বলতে অনেকেই নিজেদের সুখকে গুরুত্ব দিনা। এটা করা মোটেও উচিৎ নয়।

একতকা গল্প বলে শেষ করবো। এক রাজা বের হয়েছেন তাঁর রাজ্য ঘুরতে। আর দেখতে, তাঁর রাজত্বে প্রজারা কেমন জীবন যাপন জকরছেন। যেমন কথা তেমন কাজ, রাজা বের হয়েছেন, ঘুরছেন, ফিরছেন, কুশলাদি বিনিময় করছেন। রাজা দেখলেন, সবারই কোনো না কোন অভিযোগ আছে। আছে অশান্তি। শুধু একজন কৃষক আছেন যিনি আলাদা। যার কোনো দুঃখ নেই। রাজা তো বেশ অবাক। যাহোক, ভ্রমণ শেষে রাজা চলে এলেন। ঐ কৃষকের কথা রাজা ভুলতে পারেননি। তিনি তাঁর সভাসদ, মন্ত্রীবর্গদের ডাকলেন, ঘটনার বিবরন বর্ণনা করে কারন জানতে চাইলেন। একজন মন্ত্রির বললেন, সে কারনতা জানে। কি কারন? কারনটা হলো – তিনি নাইন্টি-নাইন ক্লাবের সদস্য না! এটা আবার কেমন? শ্রীঘ্রই বুঝবেন।

মন্ত্রী মশায় এক অদ্ভুত কাজ করলেন। তিনি ঐ রাতে হাসিখুশি কৃষকের বাড়ির সামনে গিয়ে একটা থলে রেখে আসলেন। থলেতে নিরানব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা রাখা। রাত পেরিয়ে সকাল হলো। কৃষক পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে দরজার সামনে রাখা থলেটা দেখতে পান। দ্রুত হাতে নিয়ে খুলে দেখেন তাতে নিরানব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা রাখা। প্রথম তাঁর মাথায় যে প্রশ্নটা আসলো সেটা হলো – নিরানব্বইটা কেনো? নিশ্চয়ই একশটা ছিলো। বাকি একটা গেলো কই? হাসিখুশি কৃষক পড়ে গেলেন মহা চিন্তায়। হন্নে হয়ে ঐ একটা স্বর্ণমুদ্রার খোঁজ করতে গিয়ে সেদিন আর ক্ষেতে যাওয়া হলো না। এরপর থেকে যেখানেই যান, একটা স্বর্ণমুদ্রা খুজে বেড়ান। স্বর্ণমুদ্রা তার মাথা খেতে শুরু করলো। নিরানব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা থাকার পরও সে সন্তুষ্ট নেই। আরও একটা লাগবে যে…। কৃষকমশায় দিন নাই রাত নাই, প্রচন্ড খাস্টাখাটনি শুরু করলেন। যেকোনো মূল্যে আরেকটা স্বর্ণমুদ্রা কেনার টাকা জমাতে হবে। সারাদিন প্রচন্ড খাটাখাটনি করতে করতে মেজার হয়ে যায় খিটখিটে। যেদিন আয় কম হয়, হয় বউকে পেটান, না হয় বাচ্চাকে। তাঁর সংসারে আর সুখ রইলো না।

এই দেখে মন্ত্রীমহোদয় আবার রাজার কাছে এলেন। জানালেন, তাঁর রাজ্যের সর্বশেষ সুখি মানুষটিও অসুখি হয়ে গেছে। রাজা জিজ্ঞেস করলো, কীভাবে? মন্ত্রী জবাব দিলেন, ঐ যে, নাইন্টিনাইন ক্লাবের সদস্য বানিয়ে দিয়েছি! রাজা বললেন, অনেক শুনেছি, এবার বলো নাইন্টিনাইন ক্লাব কি… মন্ত্রী বলনে, দেখুন, আমাদের প্রত্যেকের অন্তত নিরানব্বইটা কারন আছে সুখি থাকার, হাসিখুসি থাকার। কিন্তু আমরা সেগুলোর দিকে কোনো নজর দিইনা। নজর দিই সেই একতা জিনিসের দিকে, যেটা হয়ত আমার-আপনার নাই। যার কারণে আমরা অসুখি হয়ে পড়ি। ভোগবাদী এই সমাজে আরও চাই – আরও চাই করতে করতে সবার সুখ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি। তাঁর উপরে স্থান দিয়েছি ভোফগ বিলাসিতাকে। যার জন্য আমরা আজ কেউই সুখি নই। তাই নিজের সুখ-শান্তিকে যতোটা সম্ভব নাগালের মধ্যে রাখতে হবে, তাকে গুরুত্ব দিতে হবে, তাতে বিনিয়োগ করতে হবে।

সুখি মানুষের জীবনে আপনাক স্বাগতম!

দাগী আসামি থেকে ধর্মপ্রচারক – Malcolm X

মে, ১৯২৫। আমেরিকার ওকলাহোমায় আর্ল লিটল ও লুইজ লিটলের ঘরে জন্ম নেন একটা ছোট্ট ফুটফুটে শিশু। পিতা আর্ল পেশায় একজন আফ্রো-আমেরিকান ব্যাপটিস্ট মিনিস্টার। আর মা লুইজ গ্রানাডীয়-আমেরিকান এক্টিভিস্ট। রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে ১৯৩১ সালে গুপ্ত হত্যার স্বীকার হলে মাত্র ৬ বছর বাবাহীন পুত্রকে নিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়ে যান মা। ছেলে স্কুলে ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত হলেও পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। নানান কারণে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়েন, যুক্ত হন ভয়ংকর মাদক বেচাকেনার সাথে। এসব কারণে ‘ডেট্রয়েট রেড’ তকমাও জুটে যায় অল্পবয়সে। সবকিছুর একটা শেষ আছে, তারও হলো তাই-ই। মাত্র ২১ বছর বয়সে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে ঢুকতে হয় জেলখানায়। সেখানেই দেখা হয় ব্ল্যাক মুসলিমদের ডুবতে থাকা দল নেশন অফ ইসলামের ততকালীন প্রধান এলিজা মুহাম্মাদের সাথে। তার হাতে ইসলামের দীক্ষা নিয়ে নাম বদলে ফেলেন। নতুন নাম মালিক এল শাহাবাজ। তার বাগপটুতা আর চৌকশ নেতৃত্বের কারনে প্রায় অস্তমিত হতে যাওয়া ৪০০ জনের দল নেশন অফ ইসলামের সদস্য সং্খ্যা ৮ বছর পেরুতেই ঠেকে ৪০,০০০ এ। চারদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। স্বয়ং মার্টিন লুথার কিং তার কাজের ভুয়সী প্রশংসা আর সাহায্য সহযোগিতা করেন। খ্যাতির বিড়ম্বনাও ছিলো প্রচুর। তার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে এফবিআইয়ের নজরে আসেন তিনি। পরের জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে হয়েছে সাবধানে। এফবিআই নজর রাখছে যে… চরম বন্ধুর এই জীবনের গল্প ম্যালকম এক্সের। ১৯৬০ সালের দিকে জনপ্রিয় বই Roots এর লেখক আলেক্স হ্যালিকে সাথে নিয়ে নিজের জীবনীগ্রন্থ রচনায় হাত দেন মাত্র ৪০ বছর বয়সে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়া এই নেতা।

১৯৬৫ সালে তার এই বই Malcolm X নামে প্রকাশিত হলে বাজারে সাড়া পড়ে যায়, অর্জন করে বেস্টসেলার খেতাম। বইদুটি নিয়ে করা আলোচনাটি পেলাম রকমারির ইউটিউব চ্যানেলে। ভিডিওর লিংকটা দিয়ে দিলাম। আপনারা দেখতে পারেন।

তিন ভুবনের শিক্ষা ও আমার দু-পয়সা

তিন ভুবনের শিক্ষা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে অনেকেই আমাকে বইটি পড়তে বলেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ আগ্রহের কারণে আমিও তড়িঘড়ি করে বইটা সংগ্রহ করি। এই বইয়ে মূলত জাপান, নেদারল্যান্ড এবং বাংলাদেশে বসবাসকারী তিন বাবামা’র তাদের সন্তানকে গড়ে তোলার গল্প ও তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। বইয়ে ভিনদেশে থাকা বাবামাদের যে অভিজ্ঞতা, তা পড়লে সহজেই বুঝা যায় কতো আয়োজন শিক্ষার্থীদের মানুষ বানানোর জন্য, সময়ের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য, ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য। বুঝতে পারবেন উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের শিক্ষার্থীদের বইয়ের যাতাকলে নিষ্ঠুরভাবে পিষে ফেলার লোহমর্ষক বর্ণনাও।     

অনেকেই মনে করেন আচরণ, নীতি-নৈতিকতা শেখানোর দায়িত্ব পরিবারের। স্কুল আমাদের শুধু পড়াশুনাটাই শেখাবে। স্কুলের পরিধি যে শুধু পড়াশুনা শেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে জাপানী শিক্ষা ব্যবস্থা। শিশুদের পড়াশুনা জীবনের প্রথম দিন থেকে বই আর পরীক্ষার বোঝা না চাপিয়ে বরং তাদের মধ্যে আত্ননির্ভরশীলতা আর পারস্পরিক সহযোগীতার মানসিকতা গড়ে তোলাটাই তাদের প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। সাইকেল চালিয়ে দলবেঁধে স্কুলে যাওয়া, স্কুলে নিজের কাজ নিজে করা এবং বিশেষ করে বাড়িতে বাবামার কাজে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো শ্রেণীকক্ষেই শেখানোর ব্যাপারগুলো সত্যি প্রশংসাযোগ্য।

মূল্যায়ন পদ্ধতি যেকোনো শিক্ষা ব্যবস্থার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর কথা তাই আলাদা করে বলতেই হয়। এইদিকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ডাচরা। শুধু ক্লাসের পারফর্মেন্স বা পরীক্ষার খাতার ক’টা লাইন দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়না। বরং সামগ্রিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটাকে তারা ভাগ করেছে তিনভাগে। কোনো শিক্ষার্থীর সামাজিক, মানসিক এবং একাডেমিক উন্নতিকে এই মুল্যায়ন প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হয়। তাদের ক্লাসে রোল নম্বর টাইপ কিছু নেই। তারা মনে করে, এর ফলে ছোটছোট শিক্ষার্থীদের মনে ভেদাভেদ, উঁচুনিচুর বীজ বপন হতে পারে। ফলাফল তৈরির পর থাকে বাবামা’র সাথে শিক্ষদের এক-এক (ওয়ান-অন-ওয়ান) আলোচনা, যার উদ্দেশ্য সন্তানের সামগ্রিক উন্নতিকে কিভাবে আরও গতিশীল করা যায় তার কাস্টমাইজড এবং পার্সোনালাইজড সাজেশন দেয়া।

সার্টিফিকেট পরিক্ষাগুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রান ভোমরা। কতো-শতো প্রস্তুতি আমাদের বাবামাদের, কতো ত্যাগ, মাস-ছয়েক আগে থেকে বাসায় আত্নীয়স্বজনদের আসা নিষেধ – কারন সামনে বোর্ড পরিক্ষা। আর যাই হোক, এ প্লাস মিস করা যাবেনা। ছেলেমেয়ে এ প্লাস না পেলে লজ্জায় মুখ দেখাবে কীভাবে? এদিকে শিক্ষার্থীদের অবস্থাও কাহিল। ভোরে কোচিং দিয়ে শুরু, তারপর স্কুল, সেখান থেকে কোচিং, তারপর বাসায় এসে কাপড়চোপড় খুলতে না খুলতেই টিউটর। টিউটর চলে যাওয়ার পরপরই শুরু হয় বাবামা’র খবরদারী… পড়া, পড়া আর পড়া। সত্য কথা বলতে, পড়াশুনার মধ্যে এতো ডুবিয়ে রাখতে রাখতে তাদের যে একটা জীবন আছে, আমাদের বাবামা’রা সেটাই ভুলে গেছেন। বাস্তবজ্ঞানকে পাশে ঠেলে মাত্রাতিরিক্ত বই মুখিতার ফলে যেমন শেখাটা হচ্ছেনা, অন্যদিকে জীবনের অন্যদিকগুলোও হারিয়ে ফেলছি। ফলাফল শূণ্য। না শিখতে পারছি, না পারছি দক্ষতা অর্জন করতে। তাদের বোর্ড পরীক্ষা আছে, আছে সে পরীক্ষার সংশ্লিষ্ট একটা বোর্ডও, তবে তার উদ্দেশ্য যতোটা না পরীক্ষা নেয়া, তারচেয়ে ঢের বেশী হলো পরীক্ষার ভীতিকর পরিবেশ দূর করা। আর যাই হোক, শিশুদের কোমল মনে পড়াশুনা নিয়ে ভীতি তৈরি হতে দেয়া যাবেনা।

নীম পাতার পুষ্টিগুণ নিয়ে কারও কোন দ্বিধা নেই। তাই বলে তিতা নিমের কাঁচা রস যদি খেতে দেয়া হয় তাহলে কি পেটে চালান করা সম্ভব? মোটেও না। জ্ঞানের ব্যাপারটা তেমনই। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ ভাবনা আছে শিক্ষাকে ঘীরে। তিনি বলেছেন, খাওয়া খেতে গেলে সাথে না চাইলেইও কিছু হাওয়া আপনার পেটে চলে যাবে। এই হাওয়া, খাওয়ারই একটা অংশ। আপনি জোর করে পেটে হাওয়া ঢুকা বন্ধ করতে চাইলে খাওয়াটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। আমরা আমাদের সন্তানদের গড়ে তুলছি এমন এক ভয়ংকর পদ্ধতির মধ্য দিয়ে, যেখানে তাদের জোর করে গুনাগুন সমৃদ্ধ তিতা নিমের রস খাইয়ে দেয়া হয়। আর ছেলেমেয়েরা এর তেজ সহ্য করতে না পেরে বমি করে দেয়। বলি কি, ছাত্রছাত্রীদের বর্ষাকাল রচনা মুখস্ত করতে না দিয়ে তাদের নিয়ে কোন এক বর্ষামুখর দিনে বেরিয়ে পড়ুন। অথবা দলবল নিয়ে নৌকা ভ্রমনে যান। দেখবেন, তারা নিজেরাই কতো অসাধারণ বর্ননা দিবে। অবশ্য এতো বর্ষায় ভেজা আর নৌকা ভ্রমণ দিয়ে কি হবে? এসব দিয়ে কি আর এ প্লাস পাওয়া যায়?    

কাজের কথায় আসি – শিক্ষা ব্যবস্থা একটা সামগ্রিক ব্যাপার। শিক্ষার্থী, বাবামা আর শিক্ষকেরা এর প্রধান অংশীদার। সবারই সামগ্রিক প্রচেষ্টায় এগিয়ে যাবে এই ব্যবস্থা। এই এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় সরকারের কাজ হবে ছাত্রছাত্রীদের বিকশিত হওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দেয়া। সমাজের কাজ হবে পরিবর্তনকে উৎসাহিত করা। আর বাচ্চাদের কাজ হবে নিয়মনীতি আয়ত্বে আনা, দায়িত্ব পালন করা। তাহলেই বদলে যাবে দেশ ও জাতীর ভবিষ্যৎ।