আমাদের নাইন্টিনাইন ক্লাব

কতো ছোট্ট একটা জীবন। ছোট্ট এই জীবনে আমরা নানানভাবে ব্যস্ত হয়ে যাই। জড়িয়ে পড়ি মোহ-নানান মায়ায়। নানান বেড়া জালে। এই বেড়া জাল কাটিয়ে উঠতে গিয়ে আমাদের সম্মুখীন হতে হয় বিভিন্ন পরিস্থিতির। এসব পাড়ি দিতে দিতে নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলি। ফুড়ুত করে কোন সময় যে জীবনটা ফুরিয়ে যায় সেটা টেরই পাইনা। মৃত্যুর মতো সুনিশ্চিত বিষয়কে আমরা ভুলে যাই। এতো কিছু কেনো করি আমরা? কেনো জড়াই এতো মায়া? মোহে? কেনো এতো ধনসম্পদের পাহাড় গড়ি? জীবনটা একটু সাদামাটা হলেই বা সমস্যা কোথায়? অবশ্য, বোকার মতো আমরা দুনিয়ার এই ইঁদুর দৌড়ে এতোই মজে থাকি, এই প্রশ্ন মাথায় আসার সুযোগই হয়না।

অনেকদিনের ইচ্ছা একটা স্মার্টওয়াচ কিনবো। লেদারের একটা ব্যাগ নিবো। এক আউটলেটে সুন্দর ব্যাগ দেখেছি, ব্যাকপ্যাকটা চেইঞ্জ করবো। যতোবার টাকা হাতে পেয়েছি, এসবের কথায় মাথায় এসেছে। কিন্তু পরমুহুরতে ভেবেছি, না, থাক। টাকাটা বাঁচিয়ে রাখি। পরে বিপদে কাজে লাগবে। অথবা ভালো কোনো জায়গায় বিনিয়োগ করা যাবে। কিন্তু কই, অনেক টাকা এলো গেলো, বিনিয়োগ তো হলো না। না হলো বিন্যোগ, না পূরণ হল ছোট্ট ছোট্ট শখ, কি লাভ এতে? সত্যি বলতে অনেকেই নিজেদের সুখকে গুরুত্ব দিনা। এটা করা মোটেও উচিৎ নয়।

একতকা গল্প বলে শেষ করবো। এক রাজা বের হয়েছেন তাঁর রাজ্য ঘুরতে। আর দেখতে, তাঁর রাজত্বে প্রজারা কেমন জীবন যাপন জকরছেন। যেমন কথা তেমন কাজ, রাজা বের হয়েছেন, ঘুরছেন, ফিরছেন, কুশলাদি বিনিময় করছেন। রাজা দেখলেন, সবারই কোনো না কোন অভিযোগ আছে। আছে অশান্তি। শুধু একজন কৃষক আছেন যিনি আলাদা। যার কোনো দুঃখ নেই। রাজা তো বেশ অবাক। যাহোক, ভ্রমণ শেষে রাজা চলে এলেন। ঐ কৃষকের কথা রাজা ভুলতে পারেননি। তিনি তাঁর সভাসদ, মন্ত্রীবর্গদের ডাকলেন, ঘটনার বিবরন বর্ণনা করে কারন জানতে চাইলেন। একজন মন্ত্রির বললেন, সে কারনতা জানে। কি কারন? কারনটা হলো – তিনি নাইন্টি-নাইন ক্লাবের সদস্য না! এটা আবার কেমন? শ্রীঘ্রই বুঝবেন।

মন্ত্রী মশায় এক অদ্ভুত কাজ করলেন। তিনি ঐ রাতে হাসিখুশি কৃষকের বাড়ির সামনে গিয়ে একটা থলে রেখে আসলেন। থলেতে নিরানব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা রাখা। রাত পেরিয়ে সকাল হলো। কৃষক পরদিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে দরজার সামনে রাখা থলেটা দেখতে পান। দ্রুত হাতে নিয়ে খুলে দেখেন তাতে নিরানব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা রাখা। প্রথম তাঁর মাথায় যে প্রশ্নটা আসলো সেটা হলো – নিরানব্বইটা কেনো? নিশ্চয়ই একশটা ছিলো। বাকি একটা গেলো কই? হাসিখুশি কৃষক পড়ে গেলেন মহা চিন্তায়। হন্নে হয়ে ঐ একটা স্বর্ণমুদ্রার খোঁজ করতে গিয়ে সেদিন আর ক্ষেতে যাওয়া হলো না। এরপর থেকে যেখানেই যান, একটা স্বর্ণমুদ্রা খুজে বেড়ান। স্বর্ণমুদ্রা তার মাথা খেতে শুরু করলো। নিরানব্বইটা স্বর্ণমুদ্রা থাকার পরও সে সন্তুষ্ট নেই। আরও একটা লাগবে যে…। কৃষকমশায় দিন নাই রাত নাই, প্রচন্ড খাস্টাখাটনি শুরু করলেন। যেকোনো মূল্যে আরেকটা স্বর্ণমুদ্রা কেনার টাকা জমাতে হবে। সারাদিন প্রচন্ড খাটাখাটনি করতে করতে মেজার হয়ে যায় খিটখিটে। যেদিন আয় কম হয়, হয় বউকে পেটান, না হয় বাচ্চাকে। তাঁর সংসারে আর সুখ রইলো না।

এই দেখে মন্ত্রীমহোদয় আবার রাজার কাছে এলেন। জানালেন, তাঁর রাজ্যের সর্বশেষ সুখি মানুষটিও অসুখি হয়ে গেছে। রাজা জিজ্ঞেস করলো, কীভাবে? মন্ত্রী জবাব দিলেন, ঐ যে, নাইন্টিনাইন ক্লাবের সদস্য বানিয়ে দিয়েছি! রাজা বললেন, অনেক শুনেছি, এবার বলো নাইন্টিনাইন ক্লাব কি… মন্ত্রী বলনে, দেখুন, আমাদের প্রত্যেকের অন্তত নিরানব্বইটা কারন আছে সুখি থাকার, হাসিখুসি থাকার। কিন্তু আমরা সেগুলোর দিকে কোনো নজর দিইনা। নজর দিই সেই একতা জিনিসের দিকে, যেটা হয়ত আমার-আপনার নাই। যার কারণে আমরা অসুখি হয়ে পড়ি। ভোগবাদী এই সমাজে আরও চাই – আরও চাই করতে করতে সবার সুখ বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি। তাঁর উপরে স্থান দিয়েছি ভোফগ বিলাসিতাকে। যার জন্য আমরা আজ কেউই সুখি নই। তাই নিজের সুখ-শান্তিকে যতোটা সম্ভব নাগালের মধ্যে রাখতে হবে, তাকে গুরুত্ব দিতে হবে, তাতে বিনিয়োগ করতে হবে।

সুখি মানুষের জীবনে আপনাক স্বাগতম!

দাগী আসামি থেকে ধর্মপ্রচারক – Malcolm X

মে, ১৯২৫। আমেরিকার ওকলাহোমায় আর্ল লিটল ও লুইজ লিটলের ঘরে জন্ম নেন একটা ছোট্ট ফুটফুটে শিশু। পিতা আর্ল পেশায় একজন আফ্রো-আমেরিকান ব্যাপটিস্ট মিনিস্টার। আর মা লুইজ গ্রানাডীয়-আমেরিকান এক্টিভিস্ট। রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে ১৯৩১ সালে গুপ্ত হত্যার স্বীকার হলে মাত্র ৬ বছর বাবাহীন পুত্রকে নিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়ে যান মা। ছেলে স্কুলে ভালো ছাত্র হিসেবে পরিচিত হলেও পড়াশোনা বেশিদূর এগোয়নি। নানান কারণে স্কুল থেকে ঝড়ে পড়েন, যুক্ত হন ভয়ংকর মাদক বেচাকেনার সাথে। এসব কারণে ‘ডেট্রয়েট রেড’ তকমাও জুটে যায় অল্পবয়সে। সবকিছুর একটা শেষ আছে, তারও হলো তাই-ই। মাত্র ২১ বছর বয়সে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে ঢুকতে হয় জেলখানায়। সেখানেই দেখা হয় ব্ল্যাক মুসলিমদের ডুবতে থাকা দল নেশন অফ ইসলামের ততকালীন প্রধান এলিজা মুহাম্মাদের সাথে। তার হাতে ইসলামের দীক্ষা নিয়ে নাম বদলে ফেলেন। নতুন নাম মালিক এল শাহাবাজ। তার বাগপটুতা আর চৌকশ নেতৃত্বের কারনে প্রায় অস্তমিত হতে যাওয়া ৪০০ জনের দল নেশন অফ ইসলামের সদস্য সং্খ্যা ৮ বছর পেরুতেই ঠেকে ৪০,০০০ এ। চারদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। স্বয়ং মার্টিন লুথার কিং তার কাজের ভুয়সী প্রশংসা আর সাহায্য সহযোগিতা করেন। খ্যাতির বিড়ম্বনাও ছিলো প্রচুর। তার রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে এফবিআইয়ের নজরে আসেন তিনি। পরের জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপ নিতে হয়েছে সাবধানে। এফবিআই নজর রাখছে যে… চরম বন্ধুর এই জীবনের গল্প ম্যালকম এক্সের। ১৯৬০ সালের দিকে জনপ্রিয় বই Roots এর লেখক আলেক্স হ্যালিকে সাথে নিয়ে নিজের জীবনীগ্রন্থ রচনায় হাত দেন মাত্র ৪০ বছর বয়সে আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়া এই নেতা।

১৯৬৫ সালে তার এই বই Malcolm X নামে প্রকাশিত হলে বাজারে সাড়া পড়ে যায়, অর্জন করে বেস্টসেলার খেতাম। বইদুটি নিয়ে করা আলোচনাটি পেলাম রকমারির ইউটিউব চ্যানেলে। ভিডিওর লিংকটা দিয়ে দিলাম। আপনারা দেখতে পারেন।