করোনায় অর্থনীতি, পর্যালোচনায় বাংলাদেশ

সম্পূর্ণ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে আগাচ্ছে গোটা বিশ্ব। তবে এবারই প্রথম পৃথিবীর সবগুলো মানুষ একসাথে একই রকম অনুভূতি ভাগাভাগি করছে। আমরা দেখেছি প্রতি একশ বছর পরপর পৃথিবীকে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ১৭২০ সালে প্লেগ, ১৮২০ সালে কলেরা, ১৯২০ সালে স্প্যানিশ ফ্লু। আর ২০২০ সালে এসে করোনা।

পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন গোটা দুনিয়ার সব মানুষ খুব কাছাকাছি। অন্য মহামারীতে যদিও মৃত্যুর হার এখনকার তুলনায় অনেক বেশী ছিলো, তাও এতোটা বিস্তৃত হয়নি। এই অতিমাত্রার যোগাযোগ ভাইরাসকে দ্রুত ছড়াতে সাহায্য করেছে। নভেম্বর ২০১৯ সালে চীনের উহান শহরে প্রথম নভেল করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এই নিবন্ধ লিখা পর্যন্ত সাড়ে বাইশ লাখের বেশী মানুষ সংক্রমিত হয়েছে। মারা গেছে দেড় লাখের বেশী। গবেষকেরা দেখেছেন এই ভাইরাসের আর নট (R naught) মান ২.৪। অর্থাৎ, প্রতি একজন আক্রান্ত থেকে নতুন ২.৪ জন মানুষের কাছে এটা ছড়াচ্ছে।

গবেষকরেরা মনে করেন এই রোগের ভ্যাকসিন পেতে আমাদের অন্তত ১৬ থেকে ১৮ মাস লাগবে। যেহেতু ভ্যাকসিন না পাওয়া পর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়, তাই চাইলেও কোন দেশ তার স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবেনা। তাহলে নতুন করে শুরু হতে পারে সংক্রমন। চীনে ইতিমধ্যে সেটা দেখা গেছে। তবে আশার ব্যাপার হলো, এমন মহামারী পৃথিবীর কাছে নতুন নয়। প্রযুক্তি যেহেতু যেকোনো সময়ের চেয়ে উন্নত, শুরু থেকে সব অর্থনীতিবীদ আর বিজ্ঞানীরা একসাথে কাজ করছেন, তাই দ্রুত ভালো একটা কিছু আশা করাই যায়।

ইতিমধ্যে অনেক লোক মারা গেছেন, যাদের অধিকাংশই গ্লোবাল নর্থে। সামনে আরও অনেকেই মরবে। এতো উন্নত অবকাঠামো সত্ত্বেও তারা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে কতো ধানে কতো চাল। আফ্রিকা আর এশিয়ার অধিকাংশ দেশই তাদের তুলনায় সবদিকে পিছিয়ে। তাই বলা যায় ক্রান্তিকালের প্রায় পুরোটুকুই বিশ্বের এখনো বাকি। দুর্বল অর্থনীতি, দুর্বল অবকাঠামো, দুর্বল সরকার ব্যবস্থা – তিনে মিলে সামগ্রিক অবস্থার দফারফা হবে বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দরিদ্র দেশসমূহে। স্বাভাবিকভাবে দেখা যায় প্রতিটি মহামারির পর অর্থনীতিতে রিসেশন শুরু হয়। এই রিসেশনের পর দারিদ্রতা। সেখান থেকে দেখা দেয় অরাজকতা। এই মরার উপর খড়ার ঘা মোকাবেলার ক্ষমতা কতোটুকু আছে আমাদের সেটা অবশ্যই চিন্তার বিষয়।                     

স্ট্যাটিস্টার করা এক জরিপে দেখা গেছে দেশের সবচেয়ে বেশী মানুষ কাজ করে সার্ভিস সেক্টরে (প্রায় ৩৯.৭৬ শতাংশ)। কৃষি ক্ষেত্রে প্রায় সমানে সমান (৩৯.৭১ শতাংশ)। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে প্রায় সাড়ে বিশ শতাংশ। এদিকে আইএলও বলছে, ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে প্রায় ৮৫ .১ শতাংশ মানুষ। সংখ্যায় যেটা ৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৪ হাজার।

যারা সরকারী চাকুরি করেন, তারা ঠিকঠাক তাদের চাকরী ফেরত পাবেন। মহামারী পরবর্তী সরকারী কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারী চাকুরির সংখ্যা কিছু বাড়বে বরং। যারা বড় বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন, তাদেরও খুব বড় সমস্যা হওয়ার কথা না। সরকারী সাহায্য আদায় করে নেয়ার ক্ষমতা, কাঠামোগতো শক্তি ও দক্ষতা এবং ঝুঁকি মোকাবেলার তহবিল মিলিয়ে দেরিতে হলেও কাটিয়ে উঠতে পারবেন তারা। দেশের অর্থনীতির প্রধান দুই ভীত গার্মেন্টস শিল্প ও প্রবাসি শ্রমিকেরা উন্নত দেশ নির্ভর। ফলে উন্নত দেশের সাথে সাথে তাদের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার কথা।  

মূল সমস্যা হবে এই ইনফরমাল সেক্টরের। ইনফরমাল সেক্টর এমনিতেই ভঙ্গুর এবং ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের নির্দিষ্ট কোন পে-রোল/বেতন নেই। যে যার মতো কাজ বা ব্যাবসা করছেন। শুধু তাই নয়, এই সেক্টরে কর্মরতদের একেকজনের উপর একেকটা পরিবার নির্ভরশীল। একদিকে করোনাকালীন ব্যবসা লাটে উঠায় তাদের আয়ের পথ বন্ধ হবে, অন্যদিকে করোনা দীর্ঘসময় ধরে প্রভাব বজায় থাকার ফলে জমাকৃত টাকাও ফুরিয়ে যাবে। আবার, ইনফরমাল সেক্টরের লোকেরাই বড়সড় ভোক্তাশ্রেনি। ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বাজার থেকে একটা বড় ভোক্তাশ্রেণি কিছুসময়ের জন্য হলেও হারিয়ে যাবে।

তাদের জন্য সরকার যদি পর্যাপ্ত সাহায্য দেয়ও, সেগুলো নানান জটিলতায় অল্পকিছু মানুষের হাতে থেকে যাবে (ইতিমধ্যে চাল ও তেল চুরির কথা জানেন নিশ্চয়ই)। ফলে তাদের সামগ্রিক অবস্থা আরও সূচনীয় হবে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি জিইয়ে রাখার কাজে ভালো ভূমিকা রাখতে পারতো ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকের এখন যে অবস্থা, তাতে তারা সে পরিমাণ মানুষকে ঋণ দিতে পারবে কিনা, বা আদও চাইবে কিনা (যেহেতু বাজার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় খেলাপির আশংকা প্রবল হবে), অথবা ইচ্ছা বা প্রচেষ্টা থাকলেও থাকলেও সেটা রাঘব-বোয়ালের বাইরে কারও হাতে আসবে কিনা সেটাও চিন্তার বিষয়।

সরকার ইতিমধ্যে বেশ বড় অংকের প্রনোদনা ঘোষণা করেছে। সামনে হয়তো আরও করবে। কিন্তু সে প্রনোদনা সমালোচনার মুখোমুখি। দেশের সবচেয়ে বড়, পরিপক্ষ এবং ধনী গার্মেন্টস মালিকদের জন্য যেখানে ২% সুদে ঋণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে দরিদ্র কৃষকেরা পাচ্ছেন ৫% হারে। সরকার অবশ্যই চাইবে বড় শিল্পগুলোকে বাঁচাতে। তাদের জন্য সরাসরি প্রনোদনা দিবে। সে প্রনোদনা আবার স্বীয়যোগ্যতাবলে নিশ্চিতভাবে পৌঁছাবে তাদের কাছে। সবাই হয়তো ট্রিকল ডাউন ইফেক্ট আউড়াবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিল্পের মালিকেরা না চাওয়া পর্যন্ত ট্রিকলডাউন ইফেক্টের সর্বোচ্চটা পাওয়া অসম্ভব। এতোদিনের মন্দার পর তাদের মুনাফালোভী ও পুঁজিবাদী চিন্তা আরও প্রখর হবে। তাই সে আশাও গুড়েবালি।

শেষমেশ সবচেয়ে কষ্টে পড়বে ইনফরমাল সেক্টরের লোকজন। মানে, দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠরা। পুঁজি যা ছিলো, সব শেষ। সাহায্য হাতে পৌঁছাচ্ছেনা। ঋণ দিতে চাইবেনা ব্যাংক। কোনোভাবে চলতে থাকা জীবন আরও খাদের কিনারায় পৌঁছাবে। যদিও বাজারের চাহিদা আগের তুলনায় কিছুটা বাড়ার কথা, পুঁজির অভাবে আগের মতো কিছু একটা শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে। হয়তো আলো দেখাতে পারে এনজিওরা। তাদের হাত ধরে বেশকিছু মানুষ আবার নতুন উদ্যমে শুরু করবে। ধীরে ধীরে তাদের প্রসার বাড়বে। তাদের হাত ধরে নতুন আরও কিছু মানুষ ফিরে আসবে আলোতে।

করোনা পরবর্তী ব্যবসাগুলো বিশ্বায়নের বদলে স্বদেশের মাঝেই সর্বোচ্চটুকু পাওয়ার চেষ্টায় রত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটা দেশীয় শিল্পগুলোর বিকশিত হওয়ার জন্য দারুণ সুযোগ বটে। ইয়োভাল নোয়া হারারির সাথে মিলিয়ে বলতে চাই, গোটা দুনিয়াটা একটা এক্সপেরিমেন্ট এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ক ফ্রম হোম বা ইউনিভার্সাল ব্যাসিক ইনকামের মতো ব্যাপারগুলো এখন আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলোই ধীরে ধীরে নিয়মে পরিনত হবে। বলেছিলাম, বিজ্ঞানীরা দ্রুত আগাচ্ছে ভ্যাকসিনের দিকে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর সেটা উত্তর ঘুরে দক্ষিণ পর্যন্ত আসতে কতোদিন লাগবে, সেটা সবার হাতে পৌঁছানোর সামর্থ্য আছে কিনা, অথবা মহামারী পরবর্তী পরপর আসন্ন ঝুঁকিগুলো ঠিক কীভাবে কাটিয়ে উঠবে সেসব নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়ে শেষ করতে চাই – মেঘ দেখে তোরা করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে। আজ বা কাল, এই করোনাও অতীত হয়ে যাবে। কিন্তু যে শিক্ষাগুলো আমাদের দিয়ে যাচ্ছে, সেগুলো কাজে লাগানো গেলে সামনের পথ অনেক সহজ হবে নিশ্চয়ই।        

One Reply to “করোনায় অর্থনীতি, পর্যালোচনায় বাংলাদেশ”

  1. good thinking…but i think the govt job holders will get in trouble so, cause U know our bank got almost no money at this moment…and in recent times, people used to take all the deposits from there account in cash….Govt has only loaning money which will be finished early …moreover , there is almost no chance for helping from other country..So, Our govt is vulnerable, we r dishonest, all the issues will cost so much for all of us , not only for those U mentioned

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *